সাংবাদিকতা হচ্ছে বিভিন্ন ঘটনাবলী, বিষয়, ধারণা, ও মানুষ সম্পর্কিত প্রতিবেদন তৈরি ও পরিবেশন; যা উক্ত দিনের প্রধান সংবাদ এবং তা সমাজে প্রভাব বিস্তার করে। এই পেশায় শব্দটি দিয়ে তথ্য সংগ্রহের কৌশল ও সাহিত্যিক উপায় অবলম্বনকে বোঝায়। মুদ্রিত, টেলিভিশন, বেতার, ইন্টারনেট, এবং পূর্বে ব্যবহৃত নিউজরিল সংবাদ মাধ্যমের অন্তর্গত।

সাংবাদিকতার যথোপযুক্ত নিয়মের ধারণা ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন রকম হয়ে থাকে। কিছু দেশে, সংবাদ মাধ্যমে সরকারি হস্তক্ষেপে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং পুরোপুরি স্বাধীন সত্তা নয়। অন্যান্য দেশে, সংবাদ মাধ্যম সরকার থেকে স্বাধীন কিন্তু লাভ-লোকসান সাংবিধানিক নিরাপত্তার আওতায় থাকে। স্বাধীন ও প্রতিযোগিতামূলক সাংবাদিকতার মাধ্যমে সংগ্রহ করার মুক্ত উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যে প্রবেশাধিকার জনগণকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যোগ দিতে সাহায্য করে।

বিভিন্ন ধরনের পাঠকের জন্য সাংবাদিকতার বিভিন্ন ধরন রয়েছে। একটি একক প্রকাশনায় (যেমন সংবাদপত্র) বিভিন্ন ধরনের সাংবাদিকতা উপাদান থাকে এবং প্রত্যেক উপাদান বিভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হয়। সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন বা ওয়েবসাইটের প্রত্যেকটি বিভাগ ভিন্ন ভিন্ন পাঠকের জন্য সংবাদ সরবরাহ করে থাকে।

সাংবাদিকতা নানা ধরনের হতে পারে। যেমন- ওকালতি সাংবাদিকতা, সম্প্রচার সাংবাদিকতা, নাগরিক সাংবাদিকতা, উপাত্ত সাংবাদিকতা, গঞ্জো সাংবাদিকতা, পারস্পারিক ক্রিয়াশীল সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, আলোকচিত্র সাংবাদিকতা, সেন্সর সাংবাদিকতা, টেবলয়েড সাংবাদিকতা, হলুদ সাংবাদিকতা, ক্রীড়া সাংবাদিকতা ইত্যাদি।

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক মাধ্যমের বিকাশের ফলে সাংবাদিকতাকে একটি প্রক্রিয়া না বলে নির্দিষ্ট সংবাদ পণ্য বলে অভিহিত করার বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন করা হচ্ছে। এই বিবেচনায়, সাংবাদিকতা হল এক ধরনের অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া যেখানে একাধিক লেখক ও সাংবাদিক এবং সামাজিকভাবে মধ্যস্থতাকারী জনগণ জড়িত থাকে।

ইয়োহান কারোলাসের ১৬০৫ সালে স্ট্রাসবুর্গ থেকে প্রকাশিত রিলেশন অলার ফুর্নেমেন উন্ড গেডেনকভুর্ডিগেন হিস্টরিয়েনকে প্রথম সংবাদপত্র বলে অভিহিত করা হয়। প্রথম সফল ইংরেজি দৈনিক হল ১৭০২ থেকে ১৭৩৫ সালে প্রকাশিত ডেইলি ক্যুরান্ট। ১৯৫০ এর দশকে দিয়ারিও কারিওকা সংবাদপত্রের সংস্কার রূপকে ব্রাজিলে আধুনিক সাংবাদিকতার জন্ম বলে চিহ্নিত করা হয়। ১৯২০ এর দশকে যখন আধুনিক সাংবাদিকতা রূপ ধারণ করতে শুরু করে লেখক ওয়াল্টার লিপম্যান এবং মার্কিন দার্শনিক জন ডিউয়ি গণতন্ত্রে সাংবাদিকতার ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করেন। তাদের এই ভিন্ন ভিন্ন দর্শন এখনো সমাজ ও রাষ্ট্রে সাংবাদিকতার ভূমিকা বিষয়ে যুক্তি প্রদর্শনে ব্যবহৃত হয়।

সাংবাদিকতার পেশাদারী ও নৈতিক মানদণ্ড রয়েছে। বিদ্যমান নৈতিক মানদণ্ডে ভিন্নতা রয়েছে, বেশিরভাগই রীতিতে সত্যতা, সূক্ষ্মতা, বিষয়বস্তুর উদ্দেশ্য, পক্ষপাতহীনতা, এবং কৈফিয়ত – এই বিষয়গুলো সাধারণ উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই উপাদানসমূহ সংবাদ করার মত তথ্য সংগ্রহ করতে এবং জনগণের কাছে প্রচার করতে ব্যবহৃত হয়।

কিছু সাংবাদকিতার নৈতিকতার বিধিতে, বিশেষ করে ইউরোপীয় বিধিতে, সংবাদে জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বিষয়ক, এবং শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতা নিয়ে বৈষম্যমূলক সূত্র বিষয়েরও অন্তর্ভুক্তি রয়েছে। আবার কিছু ইউরোপীয় নৈতিকতার বিধিতে, সকল সংবাদপত্র ইনডিপেন্ডেন্ট প্রেস স্ট্যান্ডার্টস অর্গানাইজেশনের বিধি মেনে চলতে বাধ্য এবং তা যুক্তরাজ্যেও প্রচলিত। এই বিধিতে জনগণের গোপনীয়তাকে সম্মান দেওয়া এবং নিখুঁতভাবে কাজ নিশ্চিত করা অন্তর্ভুক্ত।

সাংবাদিকতার মৌলিক কাজের জন্য প্রয়োজন সময়, মনোযোগ এবং পরিশ্রম। এর পাশাপাশি কৌতূহল এবং জানার আগ্রহ। সাংবাদিকতার মানেই হচ্ছে মানুষকে নতুন কিছু বলা। মৌলিক সাংবাদিকতার জন্য নৈপুণ্য দরকার। সেই নৈপুণ্য আপনি শিখতে পারেন, কিন্তু এই পেশায় অনেকে মনে করছেন এই বিশেষ নৈপুণ্য কাজে লাগানোর সুযোগ ক্রমশ: কমছে।

সাংবাদিকতার মানেই হচ্ছে মানুষকে নতুন কিছু বলা, এমন কিছু বলা যেটা তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করবে, তাদের ধরে রাখবে। সকল সাংবাদিক, এমনকি যাদের নিয়ে আমরা গর্ব করি, দুশ্চিন্তায় থাকে তাদের কাজ কতটুকু মৌলিক বা অরিজিনাল হচ্ছে, তা নিয়ে। কোথা থেকে পরবর্তী অরিজিনাল স্টোরি আসবে, তা নিয়ে। মৌলিক কাজের জন্য প্রয়োজন সময়, মনোযোগ এবং পরিশ্রম। এখানে দায়সারা গোছের কিছু করলে চলবে না, এখানে কঠোর পরিশ্রম দরকার, শুধু কয়েকদিনের জন্য নয়, অনবরত। এখানে মনোভাবের প্রয়োজন হতে পারে এবং অভ্যাসের প্রয়োজন নির্ঘাত হবে।

একজন সাংবাদিক একটি রাস্তার পুরোটা হেঁটে সবাইকে চ্যালেঞ্জ করতেন যে, তিনি সেই রাস্তার ৫০০ গজের মধ্যে অন্য সবার চেয়ে বেশি স্টোরি খুঁজে পাবেন – যেমন, রাস্তায় ময়লার পরিমাণ, পার্ক করার সুবিধা, নতুন গাড়ির সংখ্যা, ট্রাফিক পুলিশ, কফির দোকান ধুমপানরত লোকজনে ভরা, কারণ অফিসে সিগারেট খাওয়া নিষেধ, দোকান খুলেছে, বন্ধ হচ্ছে, রাস্তায় ভিক্ষুক, নতুন বাড়ি-ঘর তৈরি হচ্ছে। সাংবাদিকের মনে জানার আগ্রহ এতই প্রবল হতে হবে যে, আপনি একটি সাদা দেয়াল দেখে জানতে চাইবেন, এই দেয়ালে কিছুই নাই কেন?

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে বেশ কিছু পত্রিকার মালিক-সম্পাদক দেশান্তরি হওয়ায় পূর্ববঙ্গে সংবাদপত্র প্রকাশনায় একটি শূন্যতা সৃষ্টি হয়। ঢাকায় এ সময়ে প্রকাশিত কোন দৈনিক পত্রিকার সন্ধান মেলে না। ঢাকার প্রধান পত্রিকা ছিল তখন দৈনিক আজাদ, ইত্তেহাদ এবং মর্নিং নিউজ। এগুলি প্রকাশিত হতো কলকাতা থেকে। অবশ্য বছর দুয়েক-এর মধ্যে পত্রিকাগুলি ঢাকায় চলে আসে। পরে এখান থেকে প্রকাশিত হয় ইত্তেফাক, সংবাদ, পাকিস্তান অবজারভার (পরে বাংলাদেশ অবজারভার) প্রভৃতি পত্রিকা যা আজও দেশের প্রথম সারির দৈনিক হিসেবে প্রকাশিত হয়ে চলেছে (উল্লেখ্য জুন ২০১০ থেকে অবজারভার পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেছে)।

১৯৪৭ সালে, পরে প্রথমত, পঞ্চাশের দশক, দ্বিতীয়ত, ১৯৯০ সালের পর থেকে প্রকাশিত পত্রপত্রিকার সংখ্যা এবং প্রকাশের মাত্রিকতা সাংবাদিকতা জগতের বিপুল উন্নয়নের নির্দেশক।

একজন সাংবাদিককে বর্তমানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হয়, ঘাটতে হয় নানা ধরনের নথিপত্র। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বলতে সেসব প্রতিবেদনকে বোঝায়, যেগুলো ‘বিশ্লেষণাত্মক ও কোনো একটি বিষয়কে তলিয়ে দেখার চেষ্টা করে’। কোনো কোনো সাংবাদিক আবার মনে করেন, সব রিপোর্টিংই অনুসন্ধানমূলক। বিট সাংবাদিকরা, যারা বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে কাজ করেন অথবা অনুসন্ধানী টিমের সদস্যরা, যারা কয়েক সপ্তাহ ধরে একটা স্টোরি করেন, উভয়পক্ষই অনেকাংশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কৌশল ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এর চেয়ে ব্যাপক। এতে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রণালি অনুসরণ করতে হয়। এটি এমন এক ধরনের শিল্প, যা মুঠোয় আনতে বছরের পর বছর চেষ্টা করে যেতে হয়।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পাওয়া প্রতিবেদনগুলো দেখলেই বোঝা যায়, কত ব্যাপক গবেষণা আর কঠোর শ্রম এর পেছনে ব্যয় করা হয়েছে। কঠিন একাগ্রতা, আর বিষয়ের গভীরে যাওয়ার নিষ্ঠা আছে বলেই এই স্টোরিগুলো জনগণের সম্পদ লুট, পরিবেশ বিপর্যয়, ক্ষমতার অপব্যবহার,স্বাস্থ্যসেবার করুণ দশা ইত্যাদি এত জোরালোভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন।

এসব কিছু বিবেচনায় অনলাইন সংবাদ মাধ্যম ঘাটাইলডটকম সাংবাদিকতা বা সাংবাদিককে সন্মানিত করতে ‘ঘাটাইলডটকম সম্মাননা’ পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একজন নিঃস্বার্থ সাংবাদিককে বাছাই করার প্রক্রিয়ায় কর্তৃপক্ষকে যথেষ্ট নিরপেক্ষতা ও মুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হয়েছে।

আমরা চাই, সংবাদপত্র জনগণের মুখপত্র হিসেবে কাজ করুক এবং সাংবাদিকদের মাধ্যমে জনগণের না বলতে পারা কথাগুলো উদ্ভাসিত হোক।